নিজস্ব প্রতিবেদক:
কিশোর অপরাধ ও সাইবার বুলিং রুখতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের দাবি
শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আইন, সচেতনতা ও অভিভাবকীয় নজরদারি
লেখক: মোহাম্মদ জামাল হোসেন
প্রধান শিক্ষক
চৌদ্দগ্রাম মাধ্যমিক পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
বাংলাদেশের কোমলমতি শিশু-কিশোররাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ, সামাজিক মূল্যবোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের মতো নতুন ঝুঁকিও সামনে এসেছে।
ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশু-কিশোরদের জ্ঞান অর্জন, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ঘুমের ব্যাঘাত, পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অনলাইন হয়রানির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়নের দাবি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমে বাড়ছে উদ্বেগ
দীর্ঘ সময় মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শিশু-কিশোরদের ঘুমের অভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে ঘুমের সময় ও মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এর প্রভাব পড়তে পারে পরদিনের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমেও। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের ঘাটতি, পড়াশোনায় অনীহা এবং পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকে এককভাবে শিশুদের মানসিক সমস্যা বা কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। এর প্রভাব ব্যক্তি, বয়স, ব্যবহারের ধরন, পারিবারিক পরিবেশ এবং অন্যান্য সামাজিক কারণের ওপর নির্ভর করে।
সাইবার বুলিং: নতুন ধরনের সামাজিক ঝুঁকি
অনলাইনে অপমানজনক মন্তব্য, হুমকি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে হয়রানি এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন নিপীড়ন শিশু-কিশোরদের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে অনেক শিশু ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপে বিষয়টি পরিবার কিংবা শিক্ষকদের কাছে প্রকাশ করতে চায় না। ফলে বিদ্যালয় পর্যায়ে নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বয়সভিত্তিক উদ্যোগ
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধ নিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে নির্ধারিত বয়স-নিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট তৈরি বা রাখার ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হয়েছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউবসহ বেশ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম এই বয়সসীমার আওতায় রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার আইনে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ থাকলেও সব ধরনের অনলাইন সেবা নিষিদ্ধ করা হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহায়তা, মেসেজিং ও কিছু অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে ভিন্ন বিধান রয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তায় শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং কোন প্ল্যাটফর্মে কী ধরনের বয়সসীমা থাকবে, বয়স যাচাই কীভাবে হবে এবং শিশুদের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে বর্তমান আইনি অবস্থান
বাংলাদেশের সাইবার আইনেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২১ মে ২০২৫ কার্যকর হয়েছিল। তবে এটি বর্তমানে কার্যকর আইন নয়। সরকারি আইনভাণ্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রণীত সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ দ্বারা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ রহিত করা হয়েছে।
বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ সাইবার অপরাধ, প্রতারণা, অবৈধ প্রবেশ, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন এবং ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন-সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে বিধান রয়েছে। বিশেষ করে নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে আইনে অধিকতর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
তবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পৃথক বয়সসীমা বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইনে রয়েছে—এমন তথ্য সরকারি আইনি নথিতে পাওয়া যায়নি। ফলে বাংলাদেশে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে পৃথক বয়সভিত্তিক নীতিমালা বা আইন প্রয়োজন কি না, সেটি এখন নীতিনির্ধারণী আলোচনার বিষয় হতে পারে।
আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের দাবির বিষয়
১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার দাবি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের মতপ্রকাশের অধিকার, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনা করা দরকার।
কেবল বয়সসীমা নির্ধারণ করলেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করবে, শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
সামাজিক মাধ্যম ও কিশোর অপরাধ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কিশোরদের মধ্যে যোগাযোগ, গ্রুপ তৈরি কিংবা বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সমাজে উদ্বেগ রয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং কিশোর অপরাধের মধ্যে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রয়োজন।
কিশোর অপরাধের পেছনে পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি, সহপাঠীদের প্রভাব, শিক্ষার পরিবেশ, মানসিক চাপ এবং অন্যান্য কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই অপরাধ প্রতিরোধে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সামগ্রিক ভূমিকা জোরদার করা প্রয়োজন।
শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গঠনে করণীয়
শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে—
১. বয়সভিত্তিক নীতিমালা:
১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে উপযুক্ত বয়সভিত্তিক নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন করা।
২. নিরাপদ বয়স যাচাই:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর জন্য কার্যকর কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনীয়তাসুরক্ষিত বয়স যাচাই ব্যবস্থা তৈরি করা।
৩. ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা:
বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।
৪. অভিভাবক সচেতনতা:
অভিভাবকদের সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করা এবং সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ বাড়ানো।
৫. অভিযোগ ও সহায়তা ব্যবস্থা:
বিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সাইবার বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ও সহায়তার ব্যবস্থা করা।
৬. খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রম:
শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া এবং সামাজিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়ানো।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদানের জায়গা নয়; শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই বিদ্যালয়ে নিয়মিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষকদেরও জানতে হবে কীভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীকে সহায়তা করতে হয়, কীভাবে অভিযোগ গ্রহণ করতে হয় এবং কখন অভিভাবক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো প্রয়োজন।
অভিভাবকদের করণীয়
সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং সন্তান কেন কোন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোনো অনলাইন হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন ও বন্ধুত্বপূর্ণ নজরদারি প্রয়োজন।
শিশুর সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে অনলাইনে কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে ভয় না পেয়ে মা-বাবা বা শিক্ষকের কাছে বিষয়টি জানাতে পারে।
উপসংহার
শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি ও অতিরিক্ত ডিজিটাল ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সময়ের দাবি।
১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে কি না—এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের বাস্তবতা, শিশুদের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়—ডিজিটাল শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন, অভিভাবকীয় সচেতনতা, বিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগই শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিশুদের প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও বয়সোপযোগী ডিজিটাল ব্যবহারে সক্ষম করে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
লেখক:
মোহাম্মদ জামাল হোসেন
প্রধান শিক্ষক
চৌদ্দগ্রাম মাধ্যমিক পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
দৈনিক আগামীর বাংলা